পূর্ব তিমুর (East Timor) ইন্দোনেশিয়া থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনতা লাভ করার পেছনে একটি দীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী ইতিহাস রয়েছে। এর প্রধান কারণগুলো নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
১. ভিন্ন ঔপনিবেশিক ইতিহাস
পূর্ব তিমুর এবং ইন্দোনেশিয়ার ঔপনিবেশিক ইতিহাস সম্পূর্ণ আলাদা ছিল:
ইন্দোনেশিয়া: এটি ছিল ওলন্দাজ বা ডাচ (Dutch) কলোনি।
পূর্ব তিমুর: এটি প্রায় ৪০০ বছর ধরে পর্তুগিজ (Portuguese) কলোনি ছিল।
এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পূর্ব তিমুরের মানুষের ভাষা, ধর্ম (অধিকাংশই ক্যাথলিক) এবং সংস্কৃতি ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে আলাদা হয়ে পড়ে।
২. ১৯৭৫ সালের দখলদারিত্ব
১৯৭৪ সালে পর্তুগালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তারা তাদের কলোনিগুলো ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭৫ সালে পূর্ব তিমুর স্বাধীনতা ঘোষণা করে, কিন্তু মাত্র ৯ দিন পরেই ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সুহার্তো সেখানে সামরিক অভিযান চালিয়ে তা দখল করে নেন। ইন্দোনেশিয়া একে তাদের ২৭তম প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করলেও জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই দখলদারিত্বকে কখনোই বৈধতা দেয়নি।
৩. দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ আন্দোলন
ইন্দোনেশীয় শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব তিমুরের মানুষ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। FRETILIN নামক একটি রাজনৈতিক দল এবং তাদের সশস্ত্র শাখা দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এই সময়ে ইন্দোনেশীয় বাহিনীর দমন-পীড়নে প্রায় ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ তিমুরিজ মানুষ মারা যায় (যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ)।
৪. ১৯৯১ সালের সান্তা ক্রুজ হত্যাকাণ্ড
১৯৯১ সালে দিলিতে (Dili) একটি মিছিলে ইন্দোনেশীয় সেনারা গুলি চালিয়ে শত শত মানুষকে হত্যা করে। এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে এবং পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতার দাবি আরও জোরালো হয়।
৫. রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণভোট (১৯৯৯)
১৯৯৮ সালে এশীয় অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ইন্দোনেশিয়ার একনায়ক প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর পতন ঘটে। নতুন প্রেসিডেন্ট বি.জে. হাবিবী আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পূর্ব তিমুরে একটি গণভোট আয়োজনের অনুমতি দেন।
ফলাফল: ১৯৯৯ সালের ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৭৮.৫% মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেয়।
৬. চূড়ান্ত স্বাধীনতা (২০০২)
গণভোটের পর ইন্দোনেশীয় পন্থী মিলিশিয়া বাহিনী ব্যাপক সহিংসতা শুরু করলে জাতিসংঘ সেখানে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠাতে বাধ্য হয়। এরপর কয়েক বছর জাতিসংঘের অধীনে থাকার পর ২০০২ সালের ২০ মে পূর্ব তিমুর আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের প্রথম নতুন রাষ্ট্র হিসেবে (একবিংশ শতাব্দীতে) পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে।
সংক্ষেপে: সাংস্কৃতিক ভিন্নতা, পর্তুগিজ ঐতিহ্য, ইন্দোনেশিয়ার জোরপূর্বক দখলদারিত্ব এবং দীর্ঘ ২৪ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলেই মূলত পূর্ব তিমুর আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
Comments
Post a Comment